“লাল পাহাড়ির দেশে যা” এই গানটি নিয়ে দেখলাম অনেক দ্বিমত। কেউ বলছে এইটা অর্নবের গান। কেউ বলছে ভূমি’র। আবার কেউ বলছে লোকগীতি। দ্বিধা ভাঙবার এবং সত্য কিছু তথ্য জানাবার উদ্যেশ্যে লিখলাম। একটি কবিতার গান হয়ে ওঠা এবং অজস্র গানপ্রেমী মানুষের মন জয় করার কিছু ঘটনা।

 

“একটি গাছ। নাম তার মহুয়া। ইংরেজীতে Madhuka Latifolia-যা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা বা মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলে পর্যাপ্ত দেখেছি। …… এই রকম একটি গাছ শ্রীরামপুর স্টেশনে ঠায় দাঁড়িয়ে আমি দেখছি। যেখানে শব্দের অসহ্য দামামা। লক্ষ লক্ষ মানুষের তাৎক্ষণিক দাপট নিয়ত। ট্রেনের হাঁসফাঁস। হকারের দাপাদাপি, দূষিত ধূলোর থাবা। অসহ্য দুপুর। টোপা টোপা মহুয়া ফুলের ভারে অলংকৃত দেখে মুহুর্তের মধ্যে আমার অরণ্যের কথা মনে হলো। অরণ্যবাসীদের কথা মনে পড়ে গেল। এটা কি Nucleation পর্যায় নয়?

 

এরপর আমার কেমন কষ্ট হতে লাগলো। যে শব্দটি আমাকে প্রথমেই আঘাত করলো, তার ইঙ্গিতে যেন এক চরম সত্যের স্পর্শগন্ধ রয়েছে বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করলো। শব্দটি ‘বেমানান’। আমার মতই কিংবা সবাইকার মতই গাছটি যেন ঠিক জায়গায় নেই। আমরা যেন যে যার আপাত স্বস্থানে অত্যন্ত বেমানান। যার যেখানে থাকার কথা নয়, সে যেন ঠিক সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। যেন তার চেয়ে মৃত্যু অনেক শ্রেয় ছিল। এভাবেই দশটি ঘন্টা অতিবাহিত হয়েছে- ভাবনার মধ্যে বিস্তার ঘটে চলেছে- আমাকে যেন কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না, আষ্টে পৃষ্ঠে বাধছে। ………জন্ম নিল কবিতা…

 

শ্রীরামপুর ইস্টিশনে মহুয়া গাছটা

হাই দ্যাখো গ’ তুই ইখানে কেনে,লালপাহাড়ীর দেশে যা
রাঙা মাটির দেশে যা
হেথাকে তুকে মানাইছে নাই গ’, ইক্কেবারেই মানাইছে নাই
অ-তুই লালপাহাড়ীর দেশে যা…
সিখান গেলে মাদল পাবি
মেইয়ে মরদের আদর পাবি
অ-তুই লালপাহাড়ীর দেশে যা
লারবি যদি ইক্কাই যেতে
লিস্‌ না কেনে তুয়ার সাথে
নইলে অ-তুই মরেই যা
ইক্কেবারেই মরেই যা
হাই দ্যাখো গ’, তুই ইখানে কেনে, লালপাহাড়ির দেশে যা
রাঙা মাটির দেশে যা,
রাঙা মাটির থানে যা… ।”

 

ঠিক এভাবেই ‘লাল পাহাড়ীর দেশে যা’ গানটির শুরুর কাহিনী বর্ননা করেন গানটির রচয়িতা কবি অরুন কুমার চক্রবর্তী। এই লেখাটি আমি নিয়েছি তাঁর প্রকাশিত একটি আর্টিকেল থেকে, ‘লাল পাহাড়ীর দেশে যাঃ কবিতার জন্মবিজ্ঞান’, যা ২০১০ সালে ‘AUM’নামকে একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।

 

একচল্লিশ বছর আগে ১৯৭২ সালে জন্ম নেয়া এই কবিতাটিতে সুরারোপ করেন সেই সময়ের এক উঠতি গায়ক বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের সুভাষ চক্রবর্তী ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে। সুভাষ চক্রবর্তী এই গানটি মঞ্চে মঞ্চে গান এবং প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পায়। সেই সুবাদে ১৯৭৬ সালে তখনকার নাম করা সুরকার ভি বালসারার সঙ্গীতায়োজনে এই গানটি রেকর্ড বের হয়। এরপর বাউলরা এই গানটিকে তাঁদের নিজের করে নেয় ভালোবাসা দিয়ে। তখন পর্যন্ত এই গানটির নাম ছিল ‘শ্রীরামপুর ইস্টিশনে মহুয়া গাছটা’। বাউলরা অরুন কুমার চক্রবর্তীকে গানটি বড় করার অনুরোধ জানালে তিনি ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা’ নামে আবার লিখেন এবং নতুন করে সুর করেন।

 

লাল পাহাড়ির দেশে যা

হাই দ্যাখো গ’ তুই ইখানে কেনে
অ তুই লালপাহাড়ীর দেশে যা
রাঙা মাটির দেশে যা
হেথাকে তুকে মানাইছে লাই রে
লাল পাহাড়ির দেশে যাবি
হাঁড়িয়া আর মাদল পাবি
হেথাকে তুকে মানাইছে লাই রে
নদীর ধারে শিমুল গাছ
নানা পাখির বাসা রে, নানান পাখির বাসা
কাল সকালে ফুইট্‌বে ফুল
মনে কতো আশা রে
মনে কতো আশা।
সেথাকে যাবি প্রাণ জুড়াবি
মাইয়া মরদের আদর পাবি
হেথাকে তুকে মানাইছে লাই রে
ইক্কেবারেই মানাইছে লাই রে
ভাদর আশ্বিন মাসে
ভাদু পূজার ঘটা রে, ভাদু পূজার ঘটা
তুই আমারে ভালোবেসে পালিয়ে গেলি
কেমন ব্যাপের ব্যাটা রে, কেমন বাপের বেটা
মরবি তো মরেই যা
ইক্কেবারেই মরে যা
হেথাকে তুকে মানাইছে লাই রে
ইক্কেবারেই মানাইছে লাই রে……

 

দারুণ অর্থবহ এবং অদ্ভুত সুন্দর এই গানটি গেয়েছেন অনেক গায়ক, ব্যান্ড, বাউল। অনেক লেখক ব্যবহার করেছেন তাঁদের উপন্যাসে। অনেক নাটকে, ছবিতে প্রকাশিত হয়েছে এই গান। এখানে তাঁর লেখা থেকে আরও কিছু অংশ জুড়ে দিলাম। “এখনকার ভূমি ব্যান্ড গানটা প্রায় চুরি করলো। টিভি-র অনুষ্ঠানে প্রচার হলো। অরুণের নাম বলে না দেখে ভূমির অনুষ্ঠানে, গ্রামে গঞ্জে, শহরে, কলেজের সোস্যালে প্রতিবাদ উঠলো। এখন ওরা মানতে বাধ্য হয়েছে। এভাবেই হাজারো ঘটনা ঘটে চলেছে দশক দশক ধরে- সে বড়ো মজার। ঝুপড়ি থেকে ফাইভস্টার লালপাহাড়ীর সুর ঊড়ছে।”

 

বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া এই গানটি শুনে দেখতে পারেনঃ

এবং লিরিক্সেও কিছু তারতম্য রয়েছে। উপরে অরিজিনালটা দিয়েছি।

 

সন্দ্বীপ ব্যানার্জী একটি ডকুমেন্টারি বানান যেখানে তিনি এই গানটির মূল খুঁজে ফেরেন। শেষ পর্যন্ত তিনি খুঁজে পান রচয়িতা অরুন চক্রবর্তীকে। এই ডকুমেন্টারির জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পান।

Comments

SHARE

RELATED NEWS

ভাষার গান । একুশের গান

শিরোনামঃ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো শিল্পীঃ সমবেত সংগীত সুরকারঃ শহীদ আলতাফ মাহমুদ গীতিকারঃ আব্দুল গাফফার চৌধুরী সম্পূর্ণ লিরিক্সঃ এখানে শিরোনামঃ ওরা আমার মুখের ভাষা গীতিকারঃ আব্দুল লতিফ সুরকারঃ আব্দুল লতিফ সম্পূর্ণ লিরিক্সঃ এখানে শিরোনামঃ মোদের গরব, মোদের আশা গীতিকারঃ অতুলপ্রসাদ সেন সুরকারঃ অতুলপ্রসাদ সেন সম্পূর্ণ লিরিক্সঃ এখানে শিরোনামঃ সালাম সালাম হাজার সালাম শিল্পীঃ মোহাম্মদ আবদুল […]

Read More

শ্রদ্ধাঞ্জলি,প্রিয় সঞ্জীব দা

বাংলাদেশের বাতাসে তাঁর সুর ভেসে বেড়ায়, বিষন্ন আকাশেও তিনি আছেন ভিষণভাবে, নিরন্নের, অন্ন ও পানীয়ের অধিকারও তিনি বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মানুষের পাঁজরের ইতিহাস তাঁকে ভাবাতো। ভাবাতো রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা ধর্ষিতা ইয়াসমিন,তাকে ভাবাতো হবিগঞ্জের মাটি কাটার শ্রমিকেরা,তাকে ভাবাতো গাড়িতে গুম করে নিয়ে যাওয়া তিনশ’টি লাশ। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বপ্নের কথা বলায় উদ্ধত রাইফেল আর উদ্ধত […]

Read More

বন্ধুত্বের গান | বন্ধু দিবসের গান | লিরিক্সসমুহ

      দেখা হবে বন্ধু, কারণে আর অকারণে, দেখা হবে বন্ধু চাপা কোনো অভিমানে, দেখা হবে বন্ধু-সাময়িক বৈরিতায় অস্থির অপারগতায়..   পৃথিবীর নিষ্পাপ সম্পর্কের নাম ‘বন্ধুত্ব’। বন্ধুত্ব হচ্ছে স্বার্থহীন সামাজিক সম্পর্ক। যে সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বেশি। বন্ধু মানে প্রতিশ্রুতি ছাড়া আজীবন পথচলার সঙ্গী। আজ বন্ধু দিবস। প্রতি বছর আগস্টের প্রথম রোববার এই দিবসটি […]

Read More

চলে গেলেন জেহিন আহমেদ!

চলে গেলেন মেকানিক্স ব্যান্ডের গীটারিস্ট জেহিন আহমেদ। আজ (২২ জুলাই, শনিবার) আনুমানিক ৪-৫টার দিকে আত্মহত্যা করেন তিনি। মাইলস ব্যান্ডের কিবোর্ডিস্ট মানাম আহমেদের ছেলে কেন এই আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন তা এখনো জানা যায় নি। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। Comments

Read More

শিরোনামহীন ছেড়ে দিলেন তুহীন!

“প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি জানালায় হাসিমুখ হাসিমুখে আনন্দধারা তুমি চেয়ে আছো তাই, আমি পথে হেঁটে যাই হেঁটে হেঁটে বহুদুর বহুদুর যেতে চাই” সেই মায়াভরা কন্ঠ কি আর শোনা যাবে ‘শিরোনামহীন’ এর সঙ্গে?     ১৯৯৬ সালের কথা। ইচ্ছে ছিল মনের সব সুর ভাসিয়ে দেওয়ার। সঙ্গী ছিল একটি অ্যাকুস্টিক গিটার। কীভাবে যেন তাঁর খোঁজ পেয়ে যায় আরো […]

Read More