বাংলাদেশের বাতাসে তাঁর সুর ভেসে বেড়ায়, বিষন্ন আকাশেও তিনি আছেন ভিষণভাবে, নিরন্নের, অন্ন ও পানীয়ের অধিকারও তিনি বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মানুষের পাঁজরের ইতিহাস তাঁকে ভাবাতো। ভাবাতো রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা ধর্ষিতা ইয়াসমিন,তাকে ভাবাতো হবিগঞ্জের মাটি কাটার শ্রমিকেরা,তাকে ভাবাতো গাড়িতে গুম করে নিয়ে যাওয়া তিনশ’টি লাশ। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বপ্নের কথা বলায় উদ্ধত রাইফেল আর উদ্ধত বেয়নেট তাকে থামাতে পারেনি।

 

শ্রেনী বৈষম্য আর রাষ্ট্রের তথাকথিত উন্নয়নের ভিতর যে বঞ্চনা তা বলেছেন তীব্র ক্রোধে, করুণ ব্যাঙ্গাত্মক সুরে এই ভাবে
“রেডিওতে খবর দিছে দেশে কোন অভাব নাই, নাইলার ঘরে, কাইলার ঘরে আনন্দের আর সীমা নাই, চেয়ারম্যানের সাবে বগল বাজায়, আমরা কিচ্ছু দেখছি না! অথবা “আসতিছে পরিবর্তনের হাওয়া…এদিকে তহবিল জমে, ওইদিকে চোখের পানি!”

 

সঞ্জীব সময় এবং জীবনকে দেখেছেন গভীরভাবে, আপন খেয়ালে , বেঁধেছেন গান , তুলেছেন সুর !

 

বুক জুড়ে এই বেজান শহর/ হা হা শূন্য আকাশ কাঁপাও/ আকাশ ঘিরে শঙ্খচিলের শরীর চেরা কান্না থামাও/ সমুদ্র কি তোমার ছেলে/ আদর দিয়ে চোখে মাখাও- এমন অনবদ্য অনেক কথা ও গানের জন্ম হয়েছে ক্ষণজন্মা সাংবাদিক-সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর মাধ্যমে।

সঞ্জীব চৌধুরী ছোটবেলায় হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। এরপর ঢাকার বকশী বাজার নবকুমার ইন্সটিটিউটে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯৭৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ১২তম স্থান অর্জন করেন। ১৯৮০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও মেধা তালিকায় স্থান করে নেন তিনি। তার বাবা ননী গোপাল চৌধুরী এবং মা প্রভাষিণী দেবী।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা সঞ্জীব চৌধুরী আশির দশকে সাংবাদিকতা শুরু করেন। সে সময়ই ‘শঙ্খচিল’ নামের দলে সঙ্গীতচর্চা শুরু হয় তার। সাংবাদিকতার ক্যারিয়ারে তিনি বহু বছর ‘ভোরের কাগজে’র ফিচার বিভাগে দায়িত্বরত ছিলেন। সাংবাদিকতায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। মূলত তাঁর হাত ধরেই দৈনিক পত্রিকায় ফিচার বিভাগ নিয়মিতভাবে চালু হয়। জীবদ্দশায় দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক আজকের কাগজ ও দৈনিক যায়যায়দিনে কর্মরত ছিলেন।

 

সঞ্জীব চৌধুরী ১৯৯৬ সালে সঙ্গীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গে বর্তমানের শীর্ষস্থানীয় ব্যান্ড ‘দলছুট’ গঠন করেন। বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গে দলছুট ব্যান্ড গড়ে অনেক জনপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে দলছুট ব্যান্ড তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘আহ’ প্রকাশ করে বেশ প্রশংসিত হয়। এরপর তাদের ‘হৃদয়পুর’, ‘আকাশচুরি, এবং ‘জোছনাবিহার’ অ্যালবাম থেকে একাধিক গান জনপ্রিয়তা পায়।

 

পরবর্তীতে সঞ্জীব চৌধুরীর কথা ও বাপ্পার সঙ্গীতায়োজন দলটিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। ধারাবাহিকসহ বেশ কয়েকটি নাটকেও তিনি অভিনয় করেছেন। লিখেছেন অনেক গল্প ও কবিতা। তার সুর ও গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে আছে ‘বায়োস্কোপ’, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’, ‘আমি তোমাকে বলে দিব’, ‘সাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে আউলা বাতাস’, ‘চোখ’, ‘তখন ছিল ভীষণ অন্ধকার’, ‘আহ ইয়াসমিন’, ‘রিকশা’, ‘কথা বলব না’। তার গাওয়া বাউল শাহ আবদুল করিমের লেখা ‘গাড়ি চলে না’ এবং ‘কোন মেস্তরি বানাইয়াছে নাও’ গান দুটিও বেশ প্রশংসিত।

 

সঞ্জীব চৌধুরী মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত (বাইলেটারেল সেরিব্রাল স্কিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে) কারণে ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর রাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান, ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

আজ সঞ্জীব দা’র দশম মৃত্যুবার্ষিকী। আমাদের সময়ের আর কোন গায়ক এতখানি প্রেম আর আগুণ ধরেছিলো হৃদয়ের মাঝে, অস্তিত্বের গভীরে?!

Comments

SHARE

RELATED NEWS

শিরোনামহীন ছেড়ে দিলেন তুহীন!

“প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি জানালায় হাসিমুখ হাসিমুখে আনন্দধারা তুমি চেয়ে আছো তাই, আমি পথে হেঁটে যাই হেঁটে হেঁটে বহুদুর বহুদুর যেতে চাই” সেই মায়াভরা কন্ঠ কি আর শোনা যাবে ‘শিরোনামহীন’ এর সঙ্গে?     ১৯৯৬ সালের কথা। ইচ্ছে ছিল মনের সব সুর ভাসিয়ে দেওয়ার। সঙ্গী ছিল একটি অ্যাকুস্টিক গিটার। কীভাবে যেন তাঁর খোঁজ পেয়ে যায় আরো […]

Read More

“লাল পাহাড়ির দেশে যা”- একটি কবিতার গান হয়ে ওঠা

“লাল পাহাড়ির দেশে যা” এই গানটি নিয়ে দেখলাম অনেক দ্বিমত। কেউ বলছে এইটা অর্নবের গান। কেউ বলছে ভূমি’র। আবার কেউ বলছে লোকগীতি। দ্বিধা ভাঙবার এবং সত্য কিছু তথ্য জানাবার উদ্যেশ্যে লিখলাম। একটি কবিতার গান হয়ে ওঠা এবং অজস্র গানপ্রেমী মানুষের মন জয় করার কিছু ঘটনা।   “একটি গাছ। নাম তার মহুয়া। ইংরেজীতে Madhuka Latifolia-যা বাংলা, […]

Read More

অনিকেত প্রান্তর গানটির অর্থ

প্রায় সব শ্রোতার মনেই আর্টসেলের “অনিকেত প্রান্তর” গানটির দৈর্ঘ্য ও এর প্রকৃত অর্থ নিয়ে একটি প্রশ্ন আছে, সেই প্রশ্নের জট খুলতে আর্টসেলের ভোকালিস্ট লিংকন এর ইন্টারভিউ হুবুহ তুলে দিলামঃ   আমাদের এক বন্ধু রুম্মান আহমেদ। ওর চমৎকার লেখার ক্ষমতা আছে, কিন্তু ওর চিন্তা ধারা এবং গানে শব্দচয়ন একটু ভিন্ন ধাঁচের, যাকে কঠিন বলা যেতে পারে। […]

Read More

চলে গেলেন জেহিন আহমেদ!

চলে গেলেন মেকানিক্স ব্যান্ডের গীটারিস্ট জেহিন আহমেদ। আজ (২২ জুলাই, শনিবার) আনুমানিক ৪-৫টার দিকে আত্মহত্যা করেন তিনি। মাইলস ব্যান্ডের কিবোর্ডিস্ট মানাম আহমেদের ছেলে কেন এই আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন তা এখনো জানা যায় নি। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। Comments

Read More

বন্ধুত্বের গান | বন্ধু দিবসের গান | লিরিক্সসমুহ

      দেখা হবে বন্ধু, কারণে আর অকারণে, দেখা হবে বন্ধু চাপা কোনো অভিমানে, দেখা হবে বন্ধু-সাময়িক বৈরিতায় অস্থির অপারগতায়..   পৃথিবীর নিষ্পাপ সম্পর্কের নাম ‘বন্ধুত্ব’। বন্ধুত্ব হচ্ছে স্বার্থহীন সামাজিক সম্পর্ক। যে সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বেশি। বন্ধু মানে প্রতিশ্রুতি ছাড়া আজীবন পথচলার সঙ্গী। আজ বন্ধু দিবস। প্রতি বছর আগস্টের প্রথম রোববার এই দিবসটি […]

Read More